গিয়াস-খোকনের বিদায়ে জেলা বিএনপিতে উৎসব আমেজ

সান নারায়ণগঞ্জ টুয়েন্টিফোর ডটকম:

গত ২৪ ডিসেম্বর থেকে নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির রাজনীতিতে উৎসব আমেজ বিরাজ করছে। ভিন্ন রূপে চাঙ্গা হয়ে ওঠেছে নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপি। মহানগরীর সিদ্ধিরগঞ্জ থানা এলাকা সহ সেই উৎসব আমেজ ছড়িয়েছে ফতুল্লা, রূপগঞ্জ, আড়াইহাজার ও সোনারগাঁয়ের রাজনীতিতেও। ৪ দিন যাবত চলছে জেলা বিএনপির আওতাধীন বিভিন্ন এলাকায় মিষ্টি বিতরণ। কেউ কেউ মিষ্টি বিতরণ করে একে অপরকে বলছেন, ‌‌’ঈদ মোবারক’। ধাম্ভিক অহংকারী ক্ষমতার দাপট দেখানোদের হটাত অধ:পতনে খুশি নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির সকল স্তরের নেতাকর্মীরা।

নেতাকর্মীরা বলছেন, গেল দুই বছর যাবত অযোগ্য লোকজন হটাত নেতা বনে গিয়েছিল জেলা বিএনপির রাজনীতিতে। ধরাকে সরাজ্ঞান করা যেনো তাদের কাজ। গিয়াসউদ্দীনের বলয়ের একেকজন নেতা যেনো এমপি মন্ত্রী রাষ্ট্রপতির পাওয়ার দেখানোতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। গেল ৫ আগস্টের পর গিয়াস অনুগামীরা রীতিমত আকাশে উড়ছিলেন। বিএনপিকে জনগণের মুখোমুখী দাঁড় করাচ্ছিলেন। বাস চালককে পিটিয়ে বাস ভাংচুরের মত ন্যাক্কারজনক ঘটনাও ঘটনায় গিয়াসপন্থী ইকবাল। যে কারনে গিয়াস অনুগামীদের দুই বছরের মাথায় এমন পতনকে উৎসব হিসেবে নিয়েছেন জেলা বিএনপির নেতাকর্মীরা।

প্রসঙ্গত, গত ২৪ ডিসেম্বর মঙ্গলবার বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপি’র বিষয়ে গঠিত তদন্ত কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে নারায়ণগঞ্জ জেলা কমিটি বিলুপ্ত করা হয়েছে। অতিসত্বর নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপি’র কমিটি ঘোষণা করা হবে।

কমিটি বিলুপ্তি ঘোষণার পর সিদ্ধিরগঞ্জ, ফতুল্লা থানাধীন বিভিন্ন এলাকায় আনন্দ মিছিল ও মিষ্টি বিতরণ করেছেন নেতাকর্মীরা। সিদ্ধিরগঞ্জে বিএনপি নেতা লিয়াকত হোসেন লেকু, দেলোয়ার হোসেন খোকন, স্বেচ্ছাসেবক দল রিপন সহ বিভিন্ন নেতাকর্মীরা পৃথকভাবে বিভিন্ন এলাকায় মিষ্টি বিতরণ করেছেন। তবে গিয়াসপন্থীরা কমিটি বিলুপ্তির পর ভিন্ন শ্লোগান তোলার চেষ্টা করছেন যে, যারা এমপি হবেন তাদেরকে তারেক রহমান পদ পদবীর নেতৃত্বে রাখবেন না। যদিও গিয়াসের বেলায় এমনটা প্রযোজ্য নয়। কারন তাদের কমিটি তদন্ত কমিটির তদন্তের পর তাদের সুপারিশে কমিটি বিলুপ্তি ঘোষণা করা হয়। সুতরাং গিয়াসের যে আমছালা সবই গেল সেটা প্রায় নিশ্চিত।

নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য অধ্যাপক মামুন মাহামুদের অনুগামী নেতারা রীতিমত উৎসবের জোয়ারে ভাসছেন। তারা যেনো সিদ্ধিরগঞ্জে রাহুমুক্ত হয়েছেন। তাদের যেনো মুক্তি মিলেছে এমন উৎসব করছেন।

সিদ্ধিরগঞ্জ ও ফতুল্লা থানা এলাকা নিয়ে গঠিত নারায়ণগঞ্জ-৪ সংসদীয় আসন। এই আসনে ২০০১ সালের নির্বাচনের মাত্র ২১ দিন পূর্বে আওয়ামীলীগের কেন্দ্রীয় কৃষকলীগের সিনিয়র সহ-সভাপতির পদ থেকে বিএনপিতে যোগদান করে বিএনপির মনোনয়নে এমপি নির্বাচিত হোন গিয়াসউদ্দীন। সামনের নির্বাচনেও তিনি এই আসনের মনোনয়ন প্রত্যাশি। অথচ গত ৫ আগস্টের পর পুরো জেলার সাতটি থানা এলাকায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র জনতা আন্দোলনে নিহত ও আহতের ঘটনায় ৮২টি মামলা দায়ের করা হয়, যার মধ্যে গিয়াসের এলাকা সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় ৪০টি ও ফতুল্লা থানায় ২১টি মামলা হয়। মামলাগুলো দিয়ে অনেকে মামলা ও আসামী দিয়ে বানিজ্যের অভিযোগও ওঠেছিল।

৫ আগস্টের পর ইপিজেডের ঝুট ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ নিয়ে গিয়াসের ছেলে রিফাতের সংগঠন কৃষকদল সিদ্ধিরগঞ্জ থানা কমিটির সভাপতি তৈয়ম হোসেন বাদী হয়ে মহানগর মহিলা দলের সদস্য সচিব আয়েশা আক্তার দিনা, মহানগর যুবদলের সদস্য সচিব সাহেদ আহমেদ ও মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য সচিব মমিনুর রহমান বাবুর বিরুদ্ধে কোর্টে মামলা করে দেয়। এর আগে মহানগর ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি রাকিবুর রহমান সাগরের লোকজনের সঙ্গে গিয়াসের লোকজনের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে ঝুট ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ নিয়ে। দেলোয়ার হোসেন খোকনকে গ্রেপ্তার করানো হয়। পরে বিএনপি নেতা অকিল উদ্দীন ভুঁইয়া ও খোকনকে বিএনপি থেকে বহিষ্কারের ঘোষণা করা হয়।

জেলা বিএনপির সাবেক নেতা শাহআলম মানিককেও বিএনপির অস্বীকার করা হয়। সানারপাড় ছাত্রদল নেতার সঙ্গেও সংঘর্ষ ঘটে। সিদ্ধিরগঞ্জ থানা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক গিয়াসপন্থী আকবর হোসেনও জমি দখলে যান। কয়েকদিন পর তাকে আহত করে দূর্বৃত্তরা। ফতুল্লা থানা বিএনপির সভাপতি শহিদুল ইসলাম টিটু ও সাংগঠনিক সম্পাদক রিয়াদ মোহাম্মদ চৌধুরীকে কোণঠাসা করার চেষ্টা করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে নানা ধরণের ট্যাগ দেয়া হয়। গিয়াসপন্থীরা এতটাই বেপরোয়া হয়ে ওঠেছিল যে তাদেরকে টোকাই বলেও আখ্যায়িত করেছিল।

নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপি গিয়াসউদ্দীন ও গোলাম ফারুক খোকনের নেতৃত্ব থাকায় আড়াইহাজারে কেন্দ্রীয় বিএনপির সহ-অর্থনৈতিক বিষয়ক সম্পাদক মাহমুদুর রহমান সুমন, রূপগঞ্জে বিএনপির কেন্দ্রীয় সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান দিপু ভুঁইয়ার কর্তৃৃত্ব ছিল দুটি এলাকায়। জেলা বিএনপির কমিটি বিলুপ্তির পর জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি কাজী মনিরের অনুগামীরা রূপগঞ্জে ও বিএনপির কেন্দ্রীয় ঢাকা বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক নজরুল ইসলাম আজাদ অনুগামীরা নিজ নিজ এলাকায় নতুন করে চাঙ্গা হয়ে ওঠেছেন বৃহত্তর আকারে। ২৭ ডিসেম্বর সিদ্ধিরগঞ্জের একটি অনুষ্ঠানে নজরুল ইসলাম আজাদের সামনেই মঞ্চে দাঁড়িয়ে গিয়াসউদ্দীনকে ইঙ্গিত করে বাকধোলাই দিয়ে রাগ ঝেড়েছেন আয়েশা আক্তার দিনা।

এর আগে, গত বছরের ১৮ জুন নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির সম্মেলনে সাবেক সংসদ সদস্য মো. গিয়াস উদ্দিন সভাপতি ও গোলাম ফারুক খোকন সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ২০২২ সালের ১৫ নভেম্বর গিয়াসকে আহ্বায়ক ও খোকনকে সদস্য সচিব করে জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করেছিল কেন্দ্রীয় বিএনপি। মুলত ২০২২ সালে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে তৈমূর আলম খন্দকার দলের সিদ্ধান্তের বাহিরে গিয়ে নির্বাচন করায় দল থেকে বহিষ্কৃত হোন। সেই সময় নেতৃত্ব শূণ্যতার কারনে দলের কার্যক্রমে নিস্ক্রিয় গিয়াসের হাতে নেতৃত্ব তুলে দেয় কেন্দ্রীয় বিএনপি। এর আগে ১৩/১৪ বছর যারা আন্দোলন সংগ্রাম করেছিলেন তাদেরকে মাইনাস করে গিয়াস ও তার অনুগামী নিষ্ক্রিয় অযোগ্যদের হাতে বিভিন্ন থানার কমিটি তুলে দেন।